বৃহস্পতিবার   এপ্রিল ৩ ২০২৫   ২০  চৈত্র  ১৪৩১


বান্দরবানে লামার সরই ইউনিয়নে পাহাড় নিধন ও গাছ কেটে রাবার ফ্যাক্টরির কার্যক্রম শুরুতে মারাত্নক পরিবেশ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস

Diponkor Mallik

Updated 25-Mar-30 /   |   Sadar Representative   Read : 28


বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের আন্ধারী খালের উৎপত্তিস্থলে পাহাড় আর গাছ কেটে পরিবেশ দূষন করে রাবার ফ্যাক্টরি নির্মাণের কাজ শুরু করেছে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

পাহাড় আর গাছ কাটার পাশাপাশি ওই এলাকার একমাত্র পানির উৎস আন্ধারী খালে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হলে এলাকার মানুষ আগামীতে আরো তীব্র পানি সংকটের আশংকা করছে, পরিবেশ বিপর্যয়ের এমন কর্মকান্ড দ্রুত বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী। সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষে অনেকে জানান আমাদের দেশে পাহাড় বলতে আমরা যা বুঝি, তা মাটির উচ্চ টিলা মাত্র। টিলাই হোক আর পাহাড়ই হোক; এই সুউচ্চ ভূমি বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ।

এগুলোতে প্রচুর গাছ, বৃক্ষ, তরু-লতা প্রকৃতির অকৃপণ আর্শীবাদে বেড়ে উঠে। এসব পাহাড় বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখীর অবাধ বিচরণ স্থল। এসব পাহাড়ের মধ্যে সৃষ্ট প্রাকৃতিক হ্রদ পানির যোগান দেয় এবং নানাভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করে।  সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম সরই ইউনিয়নের একমাত্র পানির উৎস আন্ধারী খাল। দীর্ঘদিন ধরে এই আন্ধারী খালের পানি ব্যবহার করে জীবনধারণ করে আসছে স্থানীয় বাসিন্দারা। এদিকে হঠাৎ করে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি রাবার কোম্পানী সরই ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের আন্ধারী খালের উৎপত্তিস্থলে বিভিন্ন গাছ আর পাহাড় কেটে তাদের একটি রাবার ফ্যাক্টরির কার্যক্রম শুরু করেছে। এদিকে হঠাৎ করেই পরিবেশ দূষণ করে বৃক্ষ নিধণ,পাহাড় কর্তনের পাশাপাশি আন্ধারী খালে বাঁধ নির্মাণের সংবাদে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। রাবার ফ্যাক্টরির কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে কয়েক হাজার পাহাড়ী আর বাঙালি জনসাধারণের কৃষি, মৎস্য চাষ ও দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের একমাত্র পানির প্রাকৃতিক উৎস আন্ধারী খালের পানি দূষণের আশঙ্কা করছে স্থানীয় জনগণ। জানা যায়, আন্ধারী খালের পানির উৎসকে ঘিরে প্রায় ৩-৪ হাজার মানুষের বসবাস, আর পরিবেশ বিধংসী এমন কর্মকান্ড করে ওই এলাকায় রাবার ফ্যাক্টরি চালু হলে আশেপাশের আমতলী পাড়া, দেবয়াপাড়া,নলুয়ার বিল,ডিসি রোড,দেরাজ মিয়া পাড়াসহ কয়েকটি পাড়ার মানুষ পানির অভাবে উচ্ছেদ হওয়ায় আশংকায় রয়েছে। দ্রুত লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর এমন কর্মকান্ড বন্ধ করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল খালেক জানান, দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই এলাকায় বসবাস করছি আর একমাত্র পানির উৎস আন্ধারী খালকে ব্যবহার করছি। কিন্তু হঠাৎ করে এই এলাকায় লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড তাদের কর্মকান্ড শুরু করার পর অনেক গাছ কেটে ফেলেছে, সে সাথে মাটি কাটার পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, আমরা জেনেছি তারা এই এলাকার একমাত্র পানির উৎস আন্ধারী খালে একটি বাঁধ দিয়ে পানির উৎস বন্ধ করে দেবে, আর যদি এমন হয় তবে এই এলাকার সাধারণ জনগণ পানির তীব্র কষ্ট পাবে। স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো.ফিরোজ জানান, আমরা এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা বাণিজ্য করে আসছি। আন্ধারী খালের পানি দিয়ে আমরা ফল-ফলাদি ও ধানসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করে তা বিক্রি করে পরিবার পরিজন নিয়ে সুখেই আছে। কিন্তু লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমাদের এই এলাকায় যে ধবংস লীলা শুরু করেছে তার জন্য আমরা চিন্তিত ও আতংকিত। স্থানীয় বাসিন্দা আছাবুর রহমান বলেন, রাবার ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি, ফ্যাক্টরির বর্জ্য আন্ধারি খালে প্রবাহের ফলে জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়া,পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে।
সরই ইউনিয়নের ঢেকিছড়া মৌজার কারবারী (পাড়া প্রধান) রম থুই ম্রো জানান,আমাদের একমাত্র পানির উৎস আন্ধারী খাল, আর সেই খাল যদি না থাকে তবে এই এলাকার ৩-৪হাজার মানুষ পানির কষ্ট পাবে,তাই দ্রুত লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নেয়া দরকার। সরই ইউনিয়নের ঢেকিছড়া মৌজার কারবারী (পাড়া প্রধান) রম থুই ম্রো আরো জানান, আমরা লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর ফ্যাক্টরিটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে ইতিমধ্যে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন জমা দিয়েছি,আশাকরি প্রশাসন দ্রুত লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর ফ্যাক্টরিটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে আশু পদক্ষেপ নেবেন। এই বিষয়ে জানতে সরই ইউনিয়নের লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর অফিসে গেলে কর্তৃপক্ষ কোন কথা বলতে রাজী হয়নি। এদিকে আন্ধারী খালের গতিপথ ঠিক রাখা এবং পরিবেশ সুরক্ষা করে এলাকার জনগণের সুন্দরভাবে বেচেঁ থাকার লক্ষ্যে এলাকাবাসী লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর কার্যক্রম বন্ধ করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। এদিকে পরিবেশ বিপর্যয়ে কোন কমকার্ন্ড পরিবেশ অধিদপ্তর সমর্থন করে না বলে মন্তব্য করে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এই বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। পরিবেশ অধিদপ্তর বান্দরবান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো.রেজাউল করিম বলেন, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর একটি ফ্যাক্টরি করার জন্য ছাড়পত্র পাওয়ায় জন্য আবেদন করেছে আর অন্যদিকে এলাকাবাসী তাদের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে আমাদের কাছে একটি আবেদন দিয়েছে। সহকারী পরিচালক আরো জানান, আমরা অতি দ্রুত সময়ে মধ্যে ওই এলাকাটি পরিদর্শন করবো এবং যদি পরিবেশের ক্ষতি হয় তাহলে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর কার্যক্রম বন্ধ করার পাশাপাশি ছাড়পত্র ও দেয়া হবে না।